আমার বরিশাল ভ্রমণ


প্রথম মাসিক পরীক্ষা শেষ। তার কিছুদিন পর গেলাম নানা বাড়ি ‘বরিশাল’। সঙ্গে ছিল আম্মু, মামা আর ছোট ভাই। বড় ভাইয়ার পরীক্ষা ছিল তাই ভাইয়া, মামি ও ছোট্ট মামাতো ভাইকে সাথে নিতে পারি নি। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে তৈরি হয়ে নিলাম। বাসে উঠে একটু ভয়ও করছিল আর খুশি খুশিও লাগছিল। কিন্তু ভাইয়া, মামি আর মামাতো ভাই গেলে আরও মজা হতো। 

আমরা বাসে উঠেছিলাম সকাল ৭ টা ৩০ মিনিটে। বগুড়া ছেড়ে সিরাজগঞ্জ এবং তারপর পাবনা জেলার উপর দিয়ে বাস এসে থামল ফেরিঘাটে। পাবনা থেকে রাজবাড়ী হলো ফেরির গন্তব্য। আর নদীটি হলো বিখ্যাত পদ্মা। আমরা ফেরিতে উঠলাম। আমি এর আগে কখনও ফেরিতে উঠিনি। মনের মধ্যে ফেরি সম্পর্কে একটা ভয় ছিল। কিন্তু ফেরিতে উঠার পর সেই ভয়টা আনন্দে রূপ নিল। ফেরিতে অনেক জায়গা। তার উপর অনেকগুলো গাড়ি ও মানুষ উঠেছে। ফেরি থেকে দেখলাম নদী ও নদীপাড়ের অপূর্ব দৃশ্যাবলী যা ছিল ছবির মতো সুন্দর। মামা আমাকে ফেরিটি ঘুরিয়ে দেখালেন। ফেরির দোতলায় উঠলাম, ঝালমুড়ি আর বাদাম কিনে খেলাম। সবচেয়ে ভালো লাগল ছোট ছোট ছেলেদের নদীতে ঝাপাঝাপি করার দৃশ্য আগে যা শুধু বইতে পড়েছি। আর দেখলাম ছোট ছোট নৌকা ও স্পিডবোট। নদী পাড় হতে এক ঘন্টা লাগলো। 

ফেরি থেকে নেমে রাজবাড়ি জেলা। তারপর ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার উপর দিয়ে গাড়ি গিয়ে ঢুকল বরিশাল জেলার মধ্যে। আমার নানাবাড়ি গৌরনদী উপজেলায়। উত্তর দিক থেকে গেলে বরিশালের প্রথম উপজেলা গৌরনদী। তাই আমাদের বরিশাল শহরে যেতে হয়নি। আমরা ঠিক ৫ টা ৩০ মিনিটে বাস থেকে নামলাম। যে যায়গায় নামলাম সে জায়গাটার নাম বাটাজোর। সেখান থেকে গন্তব্য নানাবাড়ি। নানা ভাইয়ের গ্রামের নাম শরিকল। আমরা একটা অটোরিক্সা রিজার্ভ নিলাম। অটোরিক্সায় যাওয়ার পথে রাস্তার দুপাশের দৃশ্যাবলী দেখলাম। মামা বললেন, “ধান, নদী আর খাল এই তিনে বরিশাল”। নদী দেখিনি কিন্তু দেখলাম খাল আর মাঠ ভরা ধান আর ধান। বড় বড় গাছ আর পানের বরজ দেখতে দেখতে এক সময় পৌঁছলাম নানা বাড়িতে। 

নানা বাড়িতে ঢোকার মুখে দুপাশে দুটো পুকুর। তার মাঝখান দিয়ে রাস্তা। আমাদের অটোরিক্সা গিয়ে থামল একেবারে ঘরের সামনে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আমার নানু, খালামনি, বড় নানু (নানার বড় বোন) এবং মেঝ নানু (নানার মেঝ বোন)। আমার নানা ভাই বেঁচে নেই। উনি মারা যান ২০১৯ সালে। যাই হোক, হাত মুখ ধুয়ে আশেপাশে একটু ঘুরে দেখলাম। সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল তাই আর বাইরে বের হলাম না।

রাত শেষে সকাল হলো। ঘুম থেকে উঠে একটু ঘুরতে বের হলাম। গ্রামের নির্মল পরিবেশে হেঁটে হেঁটে দেখলাম গাছপালা, রাস্তা-ঘাট আর গ্রামের মানুষের সরল জীবনযাপন। একটা গাছের উপর দেখলাম অনেক লম্বা লম্বা হালকা সোনালি বর্ণের লতা একত্রে জড়িয়ে আছে। মামা বললেন, “এগুলোই স্বর্ণলতা যার কথা তুমি বইতে পড়েছো”। মামা কয়েকটা স্বর্ণলতা ছিড়ে আমার হাতে দিলেন। বাড়িতে ফেরার পথে একটা বড় গাছের উপর বড় একটি পাখির বাসা দেখলাম। মামা বললেন ওটা বাজপাখির বাসা। পরে বাজপাখিও দেখেছি। কী বড়ো পাখি আর রাতে এমনভাবে ডাকে শুনলে ভয় লাগে।

বাসায় ফিরে নাস্তা সেরে নানাবাড়ির অন্যান্য সবার সাথে দেখা করলাম। বাড়িতে অনেকগুলো ঘর, মাঝখানে বড় উঠান। আর চারপাশটা গাছপালায় ঘেরা। দুপুরে বাড়ির কয়েকজন মামা জাল নিয়ে এলেন পুকুরে মাছ ধরার জন্য। আমি এর আগে কখনও জাল দিয়ে মাছ ধরতে দেখিনি। বড় বড় রুই, কাতলা, মৃগেল আর পাঙাস মাছ উঠল জালে। আমি মাছ ধরা ভিডিও করলাম আর মাছের ছবি তুললাম। পরের দিন অবশ্য আমি নিজেও মাছ ধরলাম। তবে জাল দিয়ে বড় মাছ নয়, বড়শি দিয়ে ছোট মাছ। এর আগে আমি কোনদিন বড়শি দিয়ে মাছ ধরিনি বা দেখিওনি, শুধু বইতে পড়েছি। নানাদের ঘরের পাশে ছোট পুকুরে বড়শি পেতে ছিপ হাতে নিয়ে বসলাম। হঠাৎ দেখি পানির উপর ভেসে থাকা কাঠিটা দূরে সরে যাচ্ছে। মামা বললেন, “টান দাও, টান দাও”। আমি ছিপ ধরে টান দিতেই একটা মাছ উঠে পড়ল পুকুর পাড়ে। মামা তাড়াতাড়ি সেটাকে চেপে ধরলেন। দেখি একটা টাকি মাছ। আমার প্রথম বড়শি দিয়ে মাছ ধরার অভিজ্ঞতা হলো। সেদিন বড়শিতে আরও একটা টাকি মাছ ও একটা পাঙাস মাছ উঠল।

পরের দিন গেলাম আম্মুর নানাবাড়ি। আমার নানাবাড়ি থেকে ৪-৫ কিলোমিটার দূরে নির্জন এক গ্রামে সেই বাড়ি। সেখানে যাওয়ার পথে অনেক কিছু দেখলাম যা ছিল আমার কাছে একেবারে নতুন। দেখলাম খালের পানিতে জোঁয়ার-ভাটা। বরিশাল সমুদ্র থেকে কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার খালেও জোঁয়ার-ভাটা দেখা যায়। দেখলাম খালের উপরে বাঁশের সাঁকো। আশেপাশের বাড়িঘরগুলো বেশিরভাগ হিন্দুদের। মামার কাছ থেকে জানলাম এর কোনটা জেলে পাড়া আবার কোনটা কুমোর পাড়া। কুমোর পাড়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মাটির পোড়া গন্ধ নাকে ভেসে এলো। দেখলাম কুমোররা মাটি দিয়ে বানিয়ে রেখেছেন হাড়ি-পাতিল। ব্রিটিশ আমলের হিন্দু মন্দির দেখলাম সেখানে। মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। অনেক মজা লাগছিল। 

আম্মুর নানাবাড়িও অনেক সুন্দর। গাছপালায় ভরা নির্জন জায়গায় বাড়িটা। একটা পুকুরও আছে। সেখানেও কিছু নতুন অভিজ্ঞতা হলো। নানা ভাই (নানুর ছোট ভাই) গরুর দুধ দোহন করছিলেন তা দেখলাম। নানা ভাই গাছ থেকে ডাব পেড়ে কেটে দিলেন আমাদের। আমরা মজা করে খেলাম। দেখলাম নানা ভাইয়ের পানের বরজ। পানের বরজে কিভাবে পান চাষ করে তা দেখার অভিজ্ঞতা হয়তো অনেকেরই হবে না এটা ভেবে অনেক আনন্দ লাগছিল। ওখানে বিকেল পর্যন্ত থেকে আমার নানাবাড়ি ফিরে এলাম। পরের দিন রোজা শুরু হয়ে গেলো। তাই আর হাটাহাটি করে বেড়ানো সম্ভব হলো না। আর বগুড়া ফেরার দিনও চলে এলো। ফেরার আগের দিন ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন গাছ থেকে ঝিঁঝিঁপোকার খোলস সংগ্রহ করলাম। মনে হচ্ছিল ঝিঁঝিঁপোকাগুলো পোশাক পাল্টে রেখে গেছে। একটি কথা বলতে ভুলে গেছি, বরিশালে যাবার পর থেকে ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শুনেছি অবিরাম। সারাদিন এমনভাবে ডাকে যে শব্দে অন্য কিছু শোনাই দায়। আর ঝিঁঝিঁপোকাদের কিভাবে ডেকে এনে ধরতে হয় তা শিখলাম। সন্ধ্যাবেলা কয়েকটা কাঠি দিয়ে একটা শুকনো বাঁশ বা কাঠের উপর আঘাত করে শব্দ করলে ঝিঁঝিঁপোকারা চলে আসে। তখন তাদের অনায়াসেই ধরা যায়। এটা সত্যির মজার একটা ব্যাপার যা অনেকেরই হয়তো জানা নেই। বরিশালের পানি অনেক লবণাক্ত। প্রথমে মনে হচ্ছিল যেন স্যালাইন খাচ্ছি।

অনেক কথা লিখলাম। কিন্তু এ লেখা এত অল্পতে শেষ করা সম্ভব নয়। আর যে স্মৃতি তা মনের মধ্যে গেথে থাকবে চিরদিন। আর এত সব অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি সাথে নিয়ে বগুড়ায় ফিরে এলাম। এবার আমাদের সঙ্গে নানু এবং খালামনিও ছিলেন। বগুড়ায় ফিরে আসার পর কয়েকদিন শুধু বরিশালের কথাই মনে পড়ছিল। বার বার মন ফিরে যেতে চাইছিল ঐ সবুজ শ্যামলে ভরা নির্জন গ্রামে। জানিনা আবার কবে যাবার সৌভাগ্য হবে। তবে প্রত্যাশায় রইলাম মজার স্মৃতিগুলো নিয়ে।


Comments

Popular posts from this blog

নিহান

স্বভাবতই ‘ণ’ ‘ষ’